arjun

arjun

Tuesday, 8 September 2015

‘খাঁচার ভেতর খাঁচা’—প্রাক্‌-কথন ও নাটকের কিছু অংশ

মহসিন মখমলবাফ-এর খাঁচার ভেতর খাঁচা (দ্য ফেন্স উইদিন দ্য ফেন্স) নাটকের কিছু অংশ 
ভাবানুবাদ ও রূপান্তর : অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় 

খাঁচার ভেতর খাঁচা’—প্রাক্‌-কথন
মহসিন মখমলবাফ (জন্ম ১৯৫৭), ইরানের এই ফিল্ম নির্মাতা ফিল্ম বানানোর ও চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি বেশ কিছু নাটকও লিখেছিলেন একসময়বেশ কিছু ছোটগল্পকয়েকটা উপন্যাসও ১৯৮০-’৮২ এই সময়-পর্বে পরপর ন' খানা নাটক লিখে ফেলেছিলেন উনি, যেটা ইরানের ইসমালিক রেভোলিউশন ঘটার (১৯৭৯) পরমুহূর্তযখন মহম্মদ রেজা শাহ্‌ পহ্‌লভীকে (যিনি ‘শাহ্‌’ নামেই বেশি পরিচিত) সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন ইমাম খোমেইনিবামপন্থী গ্রুপগুলো এক এক ক'রে খোমেইনির ইসলামিক আইনে পিছু হটছেহয় তারা জেলে, নয়তো নির্বাসনেনইলে রাষ্ট্রের সাথে হাত মেলাতে হচ্ছে বামপন্থী গ্রুপগুলো থেকে যাতে কোনোরকম বিদ্রোহ-বিপ্লব দানা বাঁধতে না-পারে, তাদের ঠেকাতে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সাথে সিপাহ্‌ পাসদারান এনঘেলাব ইসলামী (দ্য ইসলামিক রেভোলিউশন আর্মি) নামে আরো একটা আলাদা সামরিক বাহিনীই তৈরি করে ফেলেছেন খোমেইনি, ১৯৭৯ সালেইঅথচ  Communist Tudeh Party, Organizations of Iranian People’s Fedai Guerrillas (OIPFG), Iranian People’s Fedai Guerrillas (IPFG) এইরকম ছোট-বড় আরো বেশ কয়েকটি বামপন্থী মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী (সশস্ত্র-নিরস্ত্র দুই-ই) সংগঠনের সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল ইরানের রেভোলিউশনে। যারা স্টুডেন্ট মুভমেন্টগুলো অর্গানাইজ করেছেস্ট্রীট কর্ণার করেছেনমিছিল করেছেনসরকারি অফিস, থানা ও জেলগুলো ঘেরাও করেছে, দখল করেছেযাঁরা ইরানে শাহ্‌কে হটিয়ে খোমেইনির শাসনে আসার পথ সুগম করেছিলেনকিন্তু খোমেইনি ক্ষমতায় এসেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন। এঁদের ব্যান করলেন। এদের নেতারা গ্রেপ্তার হলেন। নির্বাসিত হলেন। মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেলেন। থিয়েটারে আইন চালু হ— মেয়েরা মঞ্চে অভিনয় করলে তাদের হিজাব'রে আসতে হবে মঞ্চে, পুরুষ অভিনেতাদের সাথে মঞ্চে কোনো রকম শারীরিক সংযোগ বা সংস্পর্শ দেখানো যাবে না, নাটকে নাচ থাকবে না, পপ গান থাকবে না, কমিউনিজম কিম্বা ক্যাপিটালিজম-এর কোনো বিষয় বা ঐ ভাবধারা নিয়ে নাটক করা যাবে না, ইসলাম বিরোধী কোনো কথা থাকবে না, কোনো স্ল্যাং ওয়ার্ড তো নৈব নৈব চএগুলো থাকলে সেন্সর বোর্ড সে নাটক ব্যান ক'রে দেবেএবং দিয়েওছে ব্যান ক'রে বহু বহু এর'ম দুষ্টু নাটকসেই ১৯৮১ সালে, মাত্র চব্বিশ বছর বয়েসে লেখা, মখমলবাফের এই নাটক, লেফটিস্ট গ্রুপগুলোর লিমিটেশনগুলো নিয়ে লেখাইরানে মঞ্চস্থও হয়েছিল কি সৌভাগ্যক্রমে নাটক...  দ্য ফেন্স উইদিন দ্য ফেন্স, অথবা দ্য ইনভিজিব্‌ল্‌ ফেন্স যেখানে স্বনির্মিত আত্মকারাগারে একজন বামপন্থী চোখ বুঁজে থাকছেন কিভাবে, খাঁচার গরাদে হাত না-রেখে তিনি কিছু চিন্তা করতে পারছেন না, সহবন্দীর পায়ের শেকল জং ধ'রে আলগা হয়ে গেলে বৃদ্ধ মার্ক্সবাদী বলছেন 'আমার শেকলটা নাও'বলছেন, শেকলগুলো যাতে আলগা না হয়ে যায় সে জন্য আমি আমাদের খাবারের থেকে অল্প অল্প করে তেল আর চর্বি  তুলে ঘষে ঘষে মাখিয়ে রাখতাম শেকলে। যাতে ওগুলোতে মরচে না ধরে। খুলে না যায়। কিন্তু আমার পা দুটো বড্ড সরু হয়ে গেছে। হাঁটলেই শেকলগুলো পা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু আমি কক্ষনো জেলখানার নিয়ম ভাঙবো না। তোমার সেলে ঢুকে পড়ো কমরেড। দরকার হলে তুমি আমার শেকলটা নিতে পারো। নাও, আমার শেকলটা পরে নাও তুমি। আমরা দুজনে দুজনের শেকল অদল বদল করে পরবো। কিন্তু নিয়ম ভেঙো না কমরেড। ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন...ফুটতে থাকা সময়কে কাজে না-লাগিয়ে তাঁরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন কিভাবে.. নিয়েই মখমলবাফের এই নাটক একসময় গুলিয়ে যাচ্ছে, আলাদা করা যাচ্ছে না কোন্‌টা ইরানের জেলবন্দী বৃদ্ধ মার্ক্সবাদীর মুখ, আর কোন্‌টাই বা আমার দেশের বামপন্থী নেতার। স্রেফ নিজের ভেতরের তাগিদেই তখন বসে গেছি নাটকটা অনুবাদ করতে। আমাকে যেন এটা করতেই হত। অন্যান্য যে লেখাগুলো তখন চলছিল, সবগুলোকে থামিয়ে এটায় হাত দিয়ে ফেললাম। দুদিন পরে খেয়াল করি, আমি অনুবাদে হাত দিয়েছি, ২৯শে মে। সমাপতন এমনই আশ্চর্য, মখমলবাফের জন্মদিন ছিল সেদিন।   
যদিও ‘রাজনৈতিক নাটক’ ব’লে কোনো অভিধায় আমি বিশ্বাস রাখি না। ‘থিয়েটার’ করাটাই একটি রাজনৈতিক কাজ। তবু, সাধারণভাবে বললে, এই নাটকটি প্রচণ্ডভাবে একটি রাজনৈতিক নাটক। যেখানে তৎকালীন ইরানের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ রেফারেন্স রয়েছে। আমি ঋণী ও কৃতজ্ঞ শ্রীযুক্ত সৈয়দ হবিবল্লাহ্‌ লজগী, শ্রীমতি শ্যামশ্রী দাস এবং শ্রীযুক্ত অরুণ ঘোষ-এর কাছে  সৈয়দ হবিবল্লাহ্‌ লজগী মহাশয়ের গবেষণাপত্র এবং ফারসি থেকে ওঁর ইংরেজি অনুবাদ ব্যতীত এ কাজে আমি এক পা-ও এগোতে পারতাম না। শ্রীমতি শ্যামশ্রী দাস মহোদয়া আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (C.P.I.) ভূপেশ ভবনের বিরাট গ্রন্থাগারে প্রবেশের। এবং ঐ গ্রন্থাগারের প্রবীণ গ্রন্থাগারিক শ্রীযুক্ত অরুণ ঘোষ মহাশয়, যিনি সেই ৫২ সাল থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বাষট্টি বছরের সক্রিয় সদস্য, বামপন্থী আন্দোলনকে দেখেছেন, অংশ নিয়েছেন এত দীর্ঘ বছর ধরে, ওঁর সাথে আলোচনা, তর্ক এবং ওঁর সহায়তা এই নাটকের অনুবাদে আমাকে বিপুল সাহায্য করেছে। এই নাটকের কয়েকটা সংলাপ মূলতঃ ওঁর কাছেই আলোচনা প্রসঙ্গে শোনা কথা থেকে নেওয়া। কৃতজ্ঞতা কালিমাটি পত্রিকার সম্পাদক শ্রীকাজল সেন-এর কাছেও। ধারাবাহিকভাবে এই নাটকটি কালিমাটিতে প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার জন্য।
মখমলবাফের নাটকটির হুবহু অনুবাদ আমি করিনি। অনেক জায়গায়, বিশেষ করে মার্ক্সীয় মতাদর্শের অনুশীলন নিয়ে আত্মসমালোচনামূলক বিতর্কগুলি, শোধনবাদী ও অর্থোডক্সের ডিবেট, এগুলি মূল নাটকে বিস্তৃতভাবে ছিল না। সাংকেতিক ভাবে ও সংক্ষেপে ছিল। আমি সেটাকে বিস্তৃতি দিয়ে যোগ করেছি। নাটকটিকে ইরানের প্রেক্ষাপটে রেখেও যাতে পৃথিবীর অন্য দেশে বসে এর সাথে রিলেট করা যায়, সে জন্য। পাঁচটি দৃশ্য ছিল মূল নাটকে। শেষ দৃশ্যটি আমি বাদ দিয়েছি। নাটকের প্রয়োজনেই, ওই দৃশ্যটি এখানে জরুরি মনে হয়নি। একে ভাবানুবাদ বলা যেতে পারে। বা রূপান্তর। 
পৃথিবী জুড়েই যখন ফলিত বামপন্থা ও বামপন্থী আন্দোলন মৃতপ্রায় ও পিছু হটছে; সে তার আত্মসমালোচনা করার ও তা নেবার ধৈর্য, স্থৈর্য এবং দৃঢ়তাহীন এক কালখণ্ডে তেল ফুরোনো হ্যারিকেনের মতো নিভু নিভু; পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের এই চরম রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার পর্বে, যখন এই দেশেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় একটি  থিওক্র্যাটিক দল, সেরকম একটি সময়ে হোমওয়ার্কের মতো এই নাটকটির প্রয়োজন অনুভব করছি। 


বৃদ্ধ : এটা পুরোটাই একটা নাটক। ওরা কেউ সত্যিকারের বুর্জোয়া বা সত্যিকারের জমিদার ছিল না। তবে, পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে আমার মনে হচ্ছে, ওরা কারা ছিল এটা নিশ্চিত করে এখনই বলা যাচ্ছে না। হয়তো ওরা আমাদের মতোই বিপ্লবী ছিল।
যুবক :  কিন্তু যদি ওরা বিপ্লবীই হত, তাহলে আমাদেরকে একবার অন্ততঃ বলতো সে কথা
বৃদ্ধ : এই পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমাদের সাথে একটা পরিকল্পিত চাল। এই লোকগুলো চাইছিল যাতে আমরা ওদের কথায় বিশ্বাস করে বাইরে যাই।
যুবক : তাহলে চলুন যাই.. কি সমস্যা আছে তাতে?
বৃদ্ধ : বোকার মতো ভুল কোরো না। তুমি এই দরজার বাইরে পা ফেললেই ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। আর তারপরে প্রচার করবে তুমি পালানোর চেষ্টা করছিলে। এরকম কোরো না। দরজা বন্ধ করো।
যুবক : কিন্তু ওরা গার্ডদেরও মেরে ফেললো... এই চারটে লোককেও... মানে.. আমি বলছি... কি আছে বাইরে গেলে! যদি সাবধানে যাই!? যদি দেখি এটা একটা চাল, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসব সেলে
বৃদ্ধ : গাধার মতো কাজ কোরো নাআঠারো বছর এইখানে থেকে তুমি এখনো ভালো আর খারাপের পার্থক্যটা বুঝলে না!?
যুবক : আমি জানি না বাইরে কী হচ্ছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত কিছু একটা তো হচ্ছেই এই দেওয়ালের ওপারে। কিছু একটা তো ঘটছেই। হয়তো কোনো কৃষক ধান কাটার কাস্তেটা উঁচু করে ধরেছে আঁকাবাঁকা আলপথের ওপরে। হয়তো কোনো শ্রমিকের দল হরতাল ডেকেছে কারখানায়।
বৃদ্ধ : কোন্‌ শ্রমিক? যে দেশে শিল্প-কারখানা-পুঁজিই বেড়ে উঠলো না তার দানব হাত-পা ছড়িয়ে এখনও, সেখানে কিসের বিপ্লব? তুমি দেখছো না এইলোকগুলো কিরকম স্রোতে ভাসছে! ওদের কথাগুলো শুনেছ মন দিয়ে? শ্রমিক শ্রেণী কখনো এই ভাষায় কথা বলে না কমরেড। তুমি কি ওদের মুখে লং লিভ দ্য প্রোলেতারিয়েত শুনেছো একবারও?
যুবক : হয়তো আমরা কোথাও ভুল করছি। আন্দোলনের উত্তেজনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা অতি-সরলীকরণ আসতেই পারে।
বৃদ্ধ : কিন্তু তার জন্যে প্রতিষধক থাকা দরকার কমরেড। চিন্তাশীল মনে, চিন্তার অনুশীলনে।
যুবক : আমি তো কলেজে ইতিহাসের ক্লাসে আপনারই ছাত্র ছিলাম কমরেড। ক্লাসে আপনিই এটা পড়িয়েছিলেন আমাদের। পরে পার্টি ক্লাসেও আপনিই শিখিয়েছিলেন এই তিনটে কথা সংশোধন, পুনরাবৃত্তি, আর সম্প্রসারণ। মনে পড়ছে স্যর?... ক্যাপিটালিস্টরা কিন্তু দাস ক্যাপিটাল থেকে শিখেছে কমরেড, শুধরে নেবার চেষ্টা করেছে নিজেদের ত্রুটিগুলো। আর আমরা, কমিউনিস্টরা ক্যাপিটালিস্টের কোনো কিছু পড়তে গেলে আপনারা বলেছেন ওগুলো না পড়তে, ওগুলো সি.আই.এ.-র দালালদের লেখা। জানেন, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের ঘটনা বিশ্লেষণে কোথাও ভুল হয়েছে।
বৃদ্ধ : কেন !? এরম মনে হয় কেন তোমার?
যুবক : বুঝবেন না (সেলের বাইরে পা বাড়ায়)
বৃদ্ধ : জেলখানার নিয়ম ভেঙো না কমরেড। ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন। একজন কমিউনিস্টের জীবনে ডিসিপ্লিনই সব। যেও না...
যুবক : বিদ্রোহই কমিউনিস্টের ডিসিপ্লিন।
বৃদ্ধ : কমরড যেও না বলছি...
যুবক : কিন্তু দরজা তো খোলা। সব দরজা খোলা। (বেরিয়ে এসেছে সেল থেকে) আসুন দেখে যান এই জায়গাটা...
বৃদ্ধ : পায়ের ঐ শেকল নিয়ে তুমি যেখানে যাবে, ওরা তোমাকে দেখলেই বুঝে যাবে তুমি জেল থেকে পালিয়েছ
যুবক : না ! আমি খুলে ফেলবো শেকল। এই দেখুন, মরচে ধরে গেছে এগুলোতে। (বসে পড়ে পায়ের শেকল খুলতে থাকে এক এক করে। এবং চারপাশে সেগুলো ছড়িয়ে রাখে।) ...
বৃদ্ধ : ওরকম কোরো না... শেকলগুলো যাতে আলগা না হয়ে যায় সে জন্য আমি আমাদের খাবারের থেকে অল্প অল্প করে তেল আর চর্বি তুলে ঘষে ঘষে মাখিয়ে রাখতাম শেকলে। যাতে ওগুলোতে মরচে না ধরে। খুলে না যায়। কিন্তু আমার পা দুটো বড্ড সরু হয়ে গেছে। হাঁটলেই শেকলগুলো পা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু আমি কক্ষনো জেলখানার নিয়ম ভাঙবো না। তোমার সেলে ঢুকে পড়ো কমরেড। দরকার হলে তুমি আমার শেকলটা নিতে পারো। নাও, আমার শেকলটা পরে নাও তুমি। আমরা দুজনে দুজনের শেকল অদল বদল করে পরবো। কিন্তু নিয়ম ভেঙো না কমরেড। ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন 

No comments:

Post a Comment